বাবার চলে যাওয়া

রাতে হাতটা শক্ত করে ধরে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কথা বলিনি ওনার কষ্ট হবে ভেবে। সে কথা আর বলা হয়ে উঠেনি ,উঠবেনা ! পরের দিন থেকে লাইফ সাপোর্টে । নিরন্তর চেষ্টা ,দোয়া এবং সব ভালবাসাকে অসার করে চলে গেলেন ওপারে।

আমার বাবা পরলোকগত হয়েছেন গত মাসের ১৭ তারিখে । ১৪ তারিখের সকালটাও ছিল অন্য সকালের মত প্রানবন্ত । সকালেই বাবাকে ভালবাসা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে দিন শুরু করেছিলাম। তিনি একটা পারিবারিক গ্রুপ ছবি উঠিয়ে ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ ওনার ফেইসবুক একাউন্টে পোস্ট করবেন বলে জানালেন । পরে আরো একবার কথা হল, হাসাহাসি হল আর একগাদা স্বপ্নের বীজ বোনা হল বাবা-ছেলের মধ্যে। কথা হল মার্চে কক্সবাজার বেড়াতে যাবার ব্যপারেও । ১০ টার দিকে আকস্মিক ছোট বোনের ফোন; বাবা অসুস্থ !! দ্রুত ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হল । বুকের ব্যথা কিছুতেই কমছিল না । একসময় কমলো ,চিরতরে বন্ধ হল আর আমাদের ব্যথার সুচনা হল !! আমার জীবনের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে বাবার আরোগ্য কামনা করেছিলাম। কিন্তু এক্ষেত্রেও বাবা ত্যাগই করে গেলেন।

অতি সাধারন পরিবারে জন্ম নেয়া আমার বাবার পড়াশুনার পথ ছিল বন্দুর। অন্যের বাসায় লজিং থেকে পড়াশুনা করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের কারনে সম্ভবত প্রাথমিক বৃত্তির রেজাল্ট দেয়নি, তবে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি পেয়েছিলেন। পারিবারিক প্রচন্ড অর্থাভাবের মধ্য দিয়েও তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন ।

বাবা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী এবং ক্রীড়ামোদী। ছোটবেলায় বাবা চাইতেন আমি যাতে ভালো ফুটবলার হই ; অথচ আমি খেলতাম সারাদিন ক্রিকেট !! বড় হওয়ার পর তিনি চেয়েছিলেন বিসিএস ক্যাডার । আমি সে পথ মাড়াইনি । ইচ্ছাও হয়নি। বাবা বাধ সাধেননি । ছেলের ইচ্ছায় পুর্ন আস্থা রেখেছিলেন । আস্থার প্রতিদান দেওয়া সবে শুরু হয়েছিল ; আস্থার পুর্নতা দেওয়া হয়ে উঠেনি। ছোট ছেলেকে “কোরআনে হাফেজ” করাতে চেয়েছিলেন। সেখানে তিনি শতভাগ সফল।

রাতে ভ্রমন আমার ভালো লাগত । ঢাকা থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরত্ব হওয়ার পরও বাড়ি যেতাম রাত ১২-১ টার দিকে। বাবা টর্চ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন রাস্তায়। দেখা হলে জড়িয়ে ধরতাম। রাতে একসাথে খাওয়ার পর শুরু হত আমাদের আড্ডার মজলিশ। বিছানায় শুয়ে মা-বাবা আর আমি মিলে কত শত গল্পে ভোর হয়ে যেত । ফজর নামাজ পরে ঘুমাতেন না । বাজারের সবচেয়ে বড় এবং টাটকা মাছটা আনতে হবে ছেলের জন্য । নিয়মিত কি খেতাম তা ফোন দিয়ে জানতে চাইতেন । যদি দেখতেন আমার খাবার বাসার খাবারের চেয়ে খারাপ , তিনি আর সে খাবার খেতেন না । সামান্য শরীর খারাপ করলে অজস্র ফোন আর পরামর্শ । এখন একটা ফোন আর একটা ধ্বনির” বাবা কি করো?” জন্য একরাশ হাহাকার নিয়ে দিনানিপাত করি, সেই চির পরিচিত ডাক আর শুনিনা। কেউ আমার জন্য শীতের রাত , ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আর রাস্তায় অপেক্ষা করেনা , করবেনা ।

বাবা মানেই প্রখর রোঁদে ছায়ানীড় বটবৃক্ষ । বাবার আকস্মিক প্রস্থানে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ প্রবাহমান, প্রতিনিয়ত । এই ক্ষত শুকাবার নয় । কোনো সান্ত্বনাই যথেষ্ট নয় । হয়ত দুনিয়ার স্রোতে কয়দিন পর ব্যাথার তীব্রতা কমে আসবে, চোখের অশ্রু শুকিয়ে আসবে , স্বাভাবিক জীবন যাপন করবো ; কিন্তু জীবন আগের মত কখনই হবে না , কখনই না !!

No Comments Yet.

Have Your Say